Tuesday , October 24 2017
Breaking News
Home / featured / এটা কোনো ভ্রমণগল্প নয় স্রেফ কিছু সবুজঘেরা সিম্ফনি

এটা কোনো ভ্রমণগল্প নয় স্রেফ কিছু সবুজঘেরা সিম্ফনি

এটা কোনো ভ্রমণগল্প নয় স্রেফ কিছু সবুজে ঘেরা সিম্ফনি 

বিবেকানন্দ সরকার

Nblive পোর্টজিনঃ শুরুটা হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন চাকরির খাতিরে নিজের জন্মশহর ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের করিডর শিলিগুড়িতে। বাক্স প্যাটরা নিয়ে মার্চ মাসের কোনও একদিন যাত্রা শুরু করেছিলাম নিজের ১০০ সিসির ডিসকভার নিয়ে। সেটাই ছিল আমার দীর্ঘপথে প্রথম মোটর বাইক সওয়ারি, তাও একা। সেই থেকেই শুরু। এরপর মোটর বাইক যেন জীবনের একটা অঙ্গ হয়ে ওঠে। এক অদ্ভুত নেশা, যা আমাকে বারবার ভাসিয়ে নিয়ে যায় কখনও তিস্তায়, কখনও সবুজে ঘেরা জঙ্গল, পাহাড়ে। শিলিগুড়িতে চাকরির সুবাদে পাহাড়, জঙ্গল যেন চলে আসে হাতের নাগালে। প্রকৃতির টানে বারবার ছুটে যাই কখনও পাহাড়ি রানির কোলে আবার কখনও শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে সবুজের খোঁজে।

শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার গেলেই হাতের নাগালে চলে আসে পাহাড়, জঙ্গল। তাই দিন কাটে শুধু ছুটির অপেক্ষায়। এভাবেই বেশ কয়েকবছর ছুটে বেড়িয়েছি বিভিন্ন জায়গায়। তবে মাঝে কিছুদিন সেই নেশা আমার থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু প্রেমিকাকে ছাড়া আর কতদিন? হাজার ঝগড়া বিবাদের পর মিলনের আনন্দ যে কতটা মধুর তা ফের অনুভব করি বিগত কয়েকদিন আগের ডুয়ার্স সফরে। নিজের শহর রায়গঞ্জ থেকে বেড়িয়ে সাত থেকে আটটি নদী পেরিয়ে পৌঁছে যাই জঙ্গলে। দুইদিনের বাইক সফরে সঙ্গ দেয় হাতি, গন্ডার, ময়ুর আরও কত কী…

কিন্তু বিরহ যন্ত্রণায় হাবুডুবু এই প্রাণ কতদিনই আর তাঁর প্রেমিকাকে না দেখে থাকতে পারে! তাই কিছু বন্ধু জুটিয়ে আবারও পাড়ি দিলাম জঙ্গল… পাহাড়ের কোলে।

ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ জার্নি শুরু করার প্ল্যান থাকলেও পাঁচটা নাগাদ শুরু হয়- আমাদের ছয় বন্ধুর জঙ্গল ভ্রমণের প্রথম দিন। ঘন্টায় প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে বাইক চালিয়ে বেলা ১১টার আগেই পৌঁছে যাই তিস্তার পারে। তখন উত্তর আকাশে উঁকি দিচ্ছে কাঞ্চনজঙ্গা। হাজার মানুষের ভিড়ে আচমকাই প্রাক্তন প্রেমিকাকে খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি জেগে ওঠে মনের ভেতর। তবে এইসব কিছুর মাঝেই মনে পড়ে যায় বিখ্যাত পর্বতারোহী ছন্দা গায়েনের কথা। এই সাদা বরফের চাদরে ঢাকা পর্বতের কোথাও হয়তো তিনি আজও জীবিত। সরকারি ভাবে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হলেও আমার কাছে যে তিনি আজও জীবিত, কারণ মানুষটা যে আমায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “ফিরে এসে কথা হবে” তাই কী করে মেনে নিই আমাকে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি আজ মিথ্যে! মন যে তা মানতে চায় না। এইসব ভাবনা চিন্তার আড়ালে আবডালে আচমকাই ধুলো উড়িয়ে আগমন ঘটল দলছুট পথভোলা দুই বন্ধুর। একথা সেকথা বলতে বলতেই সময় হয়ে গেল, তিস্তাকে হাত দেখিয়ে রাজাভাতখাওয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার। করলা, ধরলা, নেওড়া, মূর্তি,  বালা, দিমা নদী পেরিয়ে বিকেল ছুঁয়ে শেষ হলো আমাদের প্রথম দিন।

পরদিন সকাল হতেই শুরু হলো বক্সা, জয়ন্তির উদ্দেশ্যে পথ চলা। সঙ্গী মোটর বাইক। ঘুরে বেড়ালাম প্রকৃতির বুক চিরে। পৌঁছে গেলাম, ভুটানের জলে পরিপূর্ণ একাধিক ছোট বড় নদী পেরিয়ে বক্সা, জয়ন্তি পুকরি পাহাড়।  পৌঁছে গেলাম জয়ন্তী পেরিয়ে চুনিয়া।  নানা রকম পাখি নজর এড়াতে না পারলেও নজর এড়িয়ে জঙ্গলে বিচরণ করতে ব্যস্ত ছিল হাতি, গন্ডারের দল। তাই এবারের মতন ক্যামেরা বন্দি আর করা হলো না তাদের। অগত্যা, “বন্যরা বনে সুন্দর” এই প্রবাদ বাক্য মনে করে সান্ত্বনা দিলাম ক্ষুধার্ত হৃদিকে।

প্রথম দুদিন জঙ্গলে সময় কাটানোর পর পূর্ব পরিকল্পনামাফিক শুধুমাত্র পাহাড় ও নদীর মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পৌঁছে গেলাম ভুটান পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম ঝালঙে। জলদাপাড়া, চাপড়ামারির জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়ি পথে সঙ্গ দিল বাইক ও জলঢাকা নদীর গর্জন। গন্তব্য থেকে বহু দূরে থাকতেই জলঢাকার গর্জন নজর কেড়ে নিয়েছিল তার দিকে। নদীর বুকে নিজেকে সঁপে দেওয়ার ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন মন তখন উচাটন। কোনওক্রমে গন্তব্যে পৌঁছেই ছুটে গেলাম নদী-গর্জনকে চাক্ষুস করতে। ভাসিয়ে দিলাম নিজের আত্মাকে। যেন আক্ষরিকই “হৃদি ভেসে গেল জলঢাকানদীজলে”। প্রেমিকা হারানোর যন্ত্রণা যেন উধাও নিমেষেই। খরস্রোতা নদীর শীতলতায় শান্ত মন তখন খুঁজছিল শুধুই নিজের অস্তিত্বকে।

আচমকাই আমার শরীর ঘেঁসে নুইয়ে পড়ল গাছের পাতা। উপরে তাকাতেই বুঝলাম ভুটান পাহাড়ের কোনও এক বৃদ্ধ গাছ আমার প্রতি তার স্নেহ অঙ্গদানের কায়দায় বুঝিয়ে দিয়েছে। ফুরফুরে বাতাস, নদীর ঠান্ডা জল ও প্রাণঘাতী স্রোতের সতর্কবার্তা এড়িয়েই জমে উঠল বন্ধুদের সাথে আড্ডা। সঙ্গ দিল আকাশ কালো করে আসা মেঘের গর্জন… বৃষ্টি। আমরা ছয় বন্ধু বেছে নিলাম নিজেদের পছন্দের পাথর।  নদীর স্রোতে পা ডুবিয়ে শুরু হলো আড্ডা। তবে এ-আড্ডা অন্যান্য দিনের থেকে কিছুটা অন্যরকম।

বাকিরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকলেও আমি ছিলাম প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে ক্যামেরাবন্দী করতে। তাই এক জায়গায় বসে না থেকে প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছিল আমার ঠিকানা।
সূর্য গেছে অস্তাচল, পশ্চিম আকাশ দখল নিয়েছে পূর্ণিমারঙ। ভুটানের আকাশ তখনও জানান দিচ্ছে মেঘের অস্তিত্ব। পাহাড়ি হাওয়ায় যখন শরীর, মন শীতল ঠিক তখনই জোৎস্নার আলো গিয়ে পড়তে শুরু করেছে “জলঢাকায়”। আসলে নামটা একটু বদলে, বলা ভালো ‘জোৎস্নাঢাকা’য়।

সেদিন সারাদিনে একটি বারের জন্যও রিংটোন মনে পড়েনি। তাই ফোন হাতে নিতেই দেখি বেশ কয়েকটি মিসড কল। কিছু ব্যক্তিগত আর বেশ কয়েকটি ছিল কাজের। যদিও ছুটিতে থাকার কারণে ফোন সাইলেন্ট মোডে না থাকলেও ওই ফোনকলগুলি রিসিভ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার ছিল না। তাই ব্যক্তিগত মিসড কলগুলি ঘেঁটে দেখলাম। দুর্গম রাস্তায় বাইক সফরে নিজের বেঁচে থাকার দুঃসংবাদ বাড়িতে পৌঁছেই উঁকিঝুঁকি শুরু করলাম পুরোনো উড়োচিঠিতে। তালিকা থেকে পছন্দের এক মানুষকে পাঠিয়ে দিলাম বেশ কয়েকটি ছবি। একটু পরেই রিপ্লাই- “দারুন”। চাঁদের হাসির ছোঁয়া তখন আমার মুখেও।

একা কাটানো সময়ের ইতি ঘটল এক বন্ধুর ঈশারায়। বুঝলাম ইন্টারভাল। সময়টা এখন চায়ের। অতীত ভুলে প্রবেশ ঘটল বর্তমানে।  মাঝরাত পর্যন্ত লাগামহীন আড্ডা। কিছু অপ্রয়োজনীয় গল্পের বিষয়বস্তুকে সঙ্গ দিতে দিতে আকাশ ও চোখ দুইই তখন লাল। ঘুমের ঈশারায় লাল আভা আমাদের টেনে নিয়ে গেল বিছানায়। ছুটির শেষ ঘন্টার সাথে সাথেই বাড়ি ফেরার পালা। বাড়ি ফেরার রাস্তা যেন বাইকের চাকায় আচমকা মিশে গেল। শুরু হলো বাড়ি ফেরার যাত্রা।

তবে এখানেই শেষ নয়। এবার ডাক দিয়েছে Orchid State of India অথবা Paradise of the Botanists নামে প্রসিদ্ধ অরুণাচল প্রদেশ।সময় আপাতত অপেক্ষার ডাকনামে গাইছে গান- চলো লেটস গো…

আরও দেখুন

‘চোপ! অসভ্যতা চলছে’, ফেসবুক কান্ড নিয়ে মিছিল তৃণমূলের, বালুরঘাটে শুরু রাজনৈতিক তরজা

Nblive বালুরঘাটঃ চোপ!! অসভ্যতা চলছে। বালুরঘাট ফেসবুক কান্ডের প্রতিবাদে এমনই ব্যানার হাতে বিক্ষোভ মিছিলে সামিল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *