Monday , December 18 2017
Breaking News
Home / featured / একজন ডাক্তারের অপমৃত্যু ও একটি প্রশ্ন – শিবনাথ

একজন ডাক্তারের অপমৃত্যু ও একটি প্রশ্ন – শিবনাথ

Nblive পোর্টজিনঃ

– শিবনাথ পাল

রমেন দা সেদিন ট্রেনে উঠেই শুভকে দেখে খেঁচিয়ে উঠলো, “সরে দাঁড়া , এমন কেলানের মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” বুঝলাম, রমেনদার মুড খারাপ। হালিশহর পেরিয়ে সবাই একটু সাইজ হলে জিজ্ঞাসা করলাম, কেসটা কী রমেনদা?
– আর বলিস না কাল রাতে সন্তুটাকে ঠাঁটিয়ে চড় কষালাম, তারপর তাই নিয়ে তোর বৌদির সাথে খিঁচাইন।

সন্তু , রমেনদার ছেলে। পড়াশুনায় দারুন, নাইনে পড়ে, তুখোড় ছেলে আর খুব শান্তও বটে। এমন ছেলেকে কী কারণে চড় খেতে হল কে জানে! ভাবলাম হয়তো প্রেম ট্রেম করছে, সেজন্যই দায়িত্বশীল পিতার শাসন আর কি। যাহোক মুড অফ দেখে আর ঘাঁটালাম না।
সুদীপ আমলকি বের করে সবাইকে দিল। এখন ট্রেনে সিগারেট খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে এটাই আমাদের নতুন নেশা।
“বলতো দেখি এই মুহূর্তে জনগণের ফেভারিট পাস টাইম কি ?”— আমলকি চুষতে চুষতে রমেনদার প্রশ্ন।
শুভ বলল, “whatsapp, ফেসবুক, টুইটার, এইসব। এখন তো সারাক্ষণই দেখছি লোকে মোবাইল খোঁচাচ্ছে”।

সৌরভ বলল, হলো না বস , উত্তরটা হবে স্টার জলসা।

সুদীপ বলল , ” ধুর এক নম্বর টাইমপাস হল পি এন পি সি করা, দেখিস না, ট্রেনে বাসে, দাদু, কাকা, কাকিমা, মামা, পিসেমশাই সব্বাই শালা শুদ্ধু পরনিন্দা পরচর্চা। এ আমাদের জাতীয় এন্টারটেনমেন্ট।”

না না অন্য ভাবে ভাব– রমেনদা উড়িয়ে দিল।
আমি বোকা বোকা ভাবে বললাম “তাহলে বোধহয় আড্ডা মারা।”

ধুসশাল্লা একটাও হলো না, তোরা বাঁ– এখনো আকাট রয়ে গেলি।
এই মুহূর্তে জনগণ জেগে উঠেছে, তারা অ্যাকশনে নেমে পড়েছে। এবার খানিকটা আন্দাজ করতে পারলি, বল দেখি? পারলি না তো? শোন, এই মুহূর্তে সেরা পাস টাইম হল ডাক্তার পেটানো”।অবাক হচ্ছিস তো ?
কিন্তু কাগজ পড়লেই বুঝবি যে ডাক্তার পেটানো এই মুহূর্তে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। আর খুব সেফও বটে। ডাক্তার অতি নিরীহ প্রাণী, তার অস্ত্রশস্ত্র বলতে ইনজেকশনের সিরিঞ্জ আর মাঝে মাঝে ব্যবহৃত অপারেশনের চাকু। বেশির ভাগ ডাক্তাররাই দুবলা পাতলা টাইপের গুড বয় গুড বয় দেখতে। তারা অ্যাকচুয়ালি ছোটবেলা থেকে বেশি মারপিট করারও সুযোগ পায়নি। সুতরাং পাল্টা দু ঘা দেবার ক্ষমতা কম। সুতরাং এদের মারলে ঘুরিয়ে মার খাবার চান্স নেই, সুতরাং পেটাও। তাছাড়া কার্গিল যুদ্ধের থেকে ফিরে এলে যেমন এলাকায় একটা বীর বীর সন্মান পাওয়া যায়, এখন পুলিশ বা ডাক্তার পেটালে ততোধিক সন্মান পাওয়া যায়। কেন একটা ” কি শ্রেণী শত্রুকে কেমন খতম করে দিলুম” এরকম একটা ভাব।

শুভ বলল , রমেন দা ডাক্তারদের হয়ে বেশি দালালী কোরো না, সব এক একটা রক্ত চোষা।

“আচ্ছা শুভ তুই বল যে তোর ছোটবেলা থেকে আজ এই সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত কটা ডাক্তার তোর রক্ত চুষেছে?– রমেনদার প্রশ্ন।

“না আমার ক্ষেত্রে হয়নি কিন্তু কাগজে তো রোজ পড়ছি” — শুভর হাজির জবাব।

কিন্তু সেটা কত শতাংশ? ডাক্তাররা ইচ্ছে করে একজন পেশেন্টকে মেরে ফেলছে, এমন উদাহরণ সেই ভূত দেখার গল্পের মত, আমি দেখিনি বটে কিন্তু আমার পিসিমার দাদুর ছেলে নিজের চোখে দেখেছিল, ধরণের। শতাংশের হিসাবেও যদি ধরা হয়, তবু বলা যায় বেশী ভাল মানুষই এই ডাক্তারদের জন্যই জীবন ফিরে পায়।শোন ভাল খারাপ সব প্রফেসনেই আছে, যদি ৯০ ভাগ ডাক্তার খুনী হত তবে তুই আমি মায়ের পেট থেকে বেরোনোর আগেই পটল তুলতাম। এটাও ভেবে দেখিস।

বুঝলাম রমেন দা আবার একটি গল্প বলতে চলেছে।
ট্রেন নৈহাটী পেরোলো, আরেকটা আমলকি মুখে পুরে রমেনদা শুরু করলো , বুঝলি সুদীপ এই তো সেদিন, দেখলাম আমার পাশের পাড়ার কেলোদা , ডাঃ রায়কে কেলিয়ে থোবনা বিলা করে দেবার পরে অনেকেই ডেকে চা খাওয়াচ্ছে। কেলোদাও একটা দিগ্বিজয়ী ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেলোদাকে চিনিস তো? হ্যাঁ, এই সেই জেল ফেরত কেলো দা, আমাদের আশে পাশের তিন চারটে পাড়ার স্বঘোষিত অভিভাবক। সে তিন বার মাধ্যমিকে ফেল করেছে, দুবার জেল খেটেছে, গোটা তিনেক লোককে মার্ডার করেছে, এছাড়া তোলা আদায়, মানে ডিগ্রির ভান্ডার উপচে পড়ছে আর কি।
ব্যাপার টা কী ?চায়ের দোকানে শুনলাম , ডাক্তার রায় নাকি অপারেশন করতে গিয়ে স্বপনকে ইচ্ছে করে মেরে ফেলেছে। স্বপন আমাদের পাশের পাড়াতেই থাকে, দুদিন আগে ভয়ানক মোটর সাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। বাড়ির লোকের আগেই কেলোদা ময়দানে হাজির। সাথে তার ক্লাব জনসেবক সংঘের যোগ্য সঙ্গীরা। নার্সিং হোম ভাঙচুরের পরে তারা চড়াও হয় ডঃ রায়ের বাড়িতে। সেখানে বৌ ছেলের সামনে শুয়ার পেটানোর মত পেটায়। কেলো দা বলেছে এটা আসলে জনরোষ।

তা চায়ের দোকানে বসে আছি।কেলো দা এসে বসলো। স্পেশাল চায়ে চুমুক দিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, বুঝলি রে গান্ডু, এই বেটা রায়, মানে তোদের ডাঃ সন্দীপ রায় ,আমার সাথে পড়ত, শালা শুধু পড়ত, আমরা কত রকম ফূর্তি করতাম, গুলি খেলতাম, ঘুড়ি ওড়াতাম, ও বেটা মেদা মারা তখন সারা দিনরাত এক করে পড়াশুনা করত। শালা প্রতি ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে হয়ে মালটা একদিন জয়েন্ট না কি যেন একটা পাশ করে ডাক্তার হয়ে গেল। তখন মালটা “মুই কি হনু রে” ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াত। আজ যখন পেটাচ্ছিলুম রে সে কী কান্না, গুছিয়ে কেলালুম বুঝলি। প্রেসার মাপার যন্ত্রটা দিয়ে যখন মাথায় এক ঘা দিলুম না, তখনি শালা কেতরে গেছিল।
শালা ডাক্তারি মারাচ্ছে। এখন শালা ডাক্তার দেখলেই পেটাও। শালা ডাক্তারি করে দোহাত্তা মাল্লু কামাচ্ছে, গাড়ি কিনেছে, ভাল বাড়ি করেছে, এদিকে সেদিন ক্লাবের ফূর্তি অনুষ্ঠানে পাঁচ হাজার চাঁদা চাইতে গেলুম, শালা হাত উপুড়ই হয় না। আমাকে পর্যন্ত দেখাতে গেলে ফিজ দিতে হয়। শালা দেখ কেমন লাগে, আগে তো হসপিটাল থেকে বেরো।

স্বপন সাংঘাতিক মোটর সাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করেছিল দু দিন আগে। হেলমেট পড়েনি। মাথায় শুনলাম ইন্টারনাল হেমারেজ হয়েছিল। খুব ক্রিটিক্যাল কেস ছিল। এদিকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার মত অবস্থায় ছিল না। তো ডাঃ রায়ের নার্সিং হোমেই ভর্তি করা হয়েছিল।
দু একজন বলার চেষ্টা করলো, ছেলেটার যা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল আর যা অবস্থা ছিল, না বাঁচবারই কথা। ওর বাড়ির লোক তো আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। অত বড় অ্যাকসিডেন্ট! ডাঃ রায় তবুও চেষ্টা করেছিলেন। কেলো দা বলল , চুপ বে, ডাক্তারের দালালি করছিস। সব চুপচাপ।

স্বপনের শেষ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলাম। পঁচিশ বছরের ছেলে। খুব দুঃখের ঘটনা বুঝলি— রমেনদার মুখে বেদনার ছাপ। তারক কাকু, মানে স্বপনের বাবা বললেন , কী করব বল, ভগবান আমাকে মারল। না না আমি ডাক্তারের দোষ দিই না। ও খুব চেষ্টা করেছে বুঝলি। বৃদ্ধ মানুষটি গঙ্গার দিকে চেয়ে চুপ করে রইলেন।
ভাবলাম ডাঃ রায়ের বাড়িটাও ঘুরে যাই। পাড়ার ছেলে , ওনার বাড়িতে গেলাম, দেখলাম ডাঃ রায়ের স্ত্রী আট বছরের ছেলেকে বুকে চেপে বসে আছেন। ওর নাম শাম্ব। গাড়িটা ভেঙে পড়ে আছে। চেম্বারও ভাঙচুর হয়েছে। নার্সিংহোমের রাগ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বিকেলে খবর এল ডাঃ রায় মারা গেছেন। পুলিশ এসেছে। বাড়ির সামনে ভিড়ে ভিড়াক্কার। সবাই বলছে আহারে,উহু রে, কেন যে এমন হলো, লোকটা বড় ভাল ছিল গো। কেউ কেউ আবার স্মৃতি চারণায় মগ্ন।
দত্ত দা বললেন তার প্রথম ছেলেটা হবার সময় ডাঃ রায় এত ভালো অপারেশন করেছিলেন তার বৌ বেঁচে গেছিল। পরে কলকাতার নামকরা ডাক্তাররা বলেছিলও, ডাঃ রায় অসাধ্য সাধন করেছেন, নইলে এ পেশেন্টের বাঁচবার কথা নয়।
নিমাই কাকুও বললেন ” তোদের কাকিমাও , ঐ রায়-এর ওষুধ ছাড়া খাবে না, ওঃ গরিবের ভগবান”।

ডাক্তার বাবুর ছেলেটাকে দেখলাম, থম মেরে গেছে। কি হয়ে গেল সব ঠিক ঠাক বুঝতে পারছেনা। তরুণী বউটি মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
আবার শ্মশান যাত্রায় গেলাম। ছোট ছেলেটা মুখে আগুন দিল। ডাক্তারের মাথাটা পুরো ভেঙে দিয়েছে বুঝলি। চোখে দেখা যায় না। বুঝলি অন্য সব ডাক্তার কেমন জানি না কিন্তু এই ছেলেটা ভালো ছিল রে। কিছু অশিক্ষিত গুন্ডা, রাফিয়ান লোকটাকে সিম্পলি খুন করে ফেলল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল বুঝলি। বিশেষ করে বাচ্চা ছেলেটা বাবার মুখে আগুন দিচ্ছে, দৃশ্যটা আমাকে — রমেন দা চুপ করে গেল।

বাড়ি ফিরে তোদের বৌদির সাথে কথা বলছি। হঠাৎ সন্ত পড়া থেকে ফিরলো। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম বাবা তুই বড় হয়ে কী হতে চাস বলতো।
ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল কেন? ডাক্তার হব, কত মানুষের উপকার করা যায়, লোকে বলবে ভগবান— আর তখনি থাপ্পড়টা কষালাম। ঘুরে পড়ল বিছানায়। ছেলেটা পুরো হতভম্ব হয়ে গেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর মায়ের সাথেও ঝগড়া হল।

শালা ডাক্তার হয়ে কি লাভ টা হবে বলতো। চোখের সামনে একটাকে তো মরতে দেখলাম। কী হবে বলতো ? কয়েকটা মস্তান হুমকি দেবে, বিচার করবে চিকিৎসা ঠিক হলো কিনা? বুঝবে না সুঝবে না পিটিয়ে খাল খিঁচে দেবে। বলত সব ডাক্তারই খারাপ , সবাই চামার? সবাই ডাকাত? তাহলে এত যে গণ্ডা গণ্ডা মানুষ সুস্থ হচ্ছে, জীবন ফিরে পাচ্ছে, সব মিথ্যে? মনটা খিঁচরে আছে বুঝলি।
তোদের কাছে সত্যি বলছি বুঝলি, ঐ সব ডাক্তার ফাকতার হয়ে কোনো লাভ নেই। ছেলে আমার বরং কেলো দার মত হোক, এলাকায় সন্মান আছে, প্রতিপত্তি আছে , আর কেলোদারাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ। তোরা কি বলিস?
কেউই জবাব খুঁজে পেলাম না।

রমেন দা ট্রেনে র দরজা দিয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ট্রেন চলছে, কোথায় পৌঁছবে শেষ পর্যন্ত কে জানে?

আরও দেখুন

মাঝ ডিসেম্বরে পড়ল শীত, কুয়াশায় আচ্ছন্ন রায়গঞ্জ। দেখুুুন ভিডিও

Nblive রায়গঞ্জঃ মাঝ ডিসেম্বরে পড়ল শীত, কুয়াশায় আচ্ছন্ন রায়গঞ্জ। দেখুুুন ভিডিও