Home > featured > মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই
মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

 

NBlive পোর্টজিনঃ সারাবছর যে বাঙালি বেলা পর্যন্ত নাক ডেকে ঘুমোয়, তারও বোধোদয় হয় মহালয়ার দিন। হবেই বা না কেন? এ যে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব - শারদোৎসবের সূচনা। পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনার সন্ধিক্ষণকে বলা হয় মহালয়া। এই দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়ে থাকে। তাঁদের উদ্দেশ্যে জলদান ও শ্রদ্ধা জানানোও হয়ে থাকে।

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

আশ্বিন মাসের মধ্যবর্তী সময়। দিগন্তজোড়া সাদা শরৎ মেঘের ছড়াছড়ি। নদী তীরে পাড় বরাবর কাশবন। যেন সাদা সামিয়ানা। শিউলির গন্ধ ঝরা সকাল। এসে গেছে কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম তিথি। এসে গেছে মহালয়া। মহালয়া এলেই বাংলার প্রকৃতি, মাটি-নদী-আকাশ মাতৃপূজার মহালগ্নকে বরণ করতে যেন প্রস্তুত হয়।

মহালয়া এলেই দেবী বন্দনার সুর বাংলার আপামর মানুষের হৃদয়ে ধ্বনিত হয়। ঢাকের আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসে। বুকে জাগে আনন্দ শিহরিত কাঁপন। কারণ মা আসছেন যে। উৎসব তো সকলের জন্য - এই মনোভাব নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় শরতের দুর্গাপূজা। এ তো সার্বজনীন উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ আর উপভোগে সফল হয় এই উৎসব। যা শুরু হয় মহালয়া থেকে।

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

এবার আসা যাক মহালয়া প্রসঙ্গে। মহালয়া অতি পুণ্যময় এক তিথি। বয়োজেষ্ঠদের কাছ থেকে জেনেছি এই তিথিতে পৃথিবী পবিত্র স্বর্গলোকে পরিণত হয়। স্বর্গত পিতৃপুরুষগণ তাঁর বংশধরদের কাছে হাজির হন। প্রিয় দ্রব্যাদি গ্রহণ করেন আর প্রাণভরে আর্শীবাদ করেন। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে পিতৃতর্পণ ও পিতৃ শ্রাদ্ধ । স্থানীয় জলাশয় বা নদীতে মহালয়ার দিন পিতৃ তর্পণ ও পিতৃ শ্রাদ্ধের জন্য বহুলোকের সমাগম হয়। তাঁরা তাদের পূর্ব পুরুষদের স্মরণ করেন। পূর্বপুরুষদের প্রতি মানসিক ও আত্মিক সংযোগ স্থাপন করেন । নিবেদন করেন তাঁদের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম। জানা যায়, মহালয়া এমন এক পুণ্যময় তিথি, যে তিথিতে নিয়মের বাইরেও সকল পূর্বপুরুষের শ্রাদ্ধ করা যায়। যে সকল ব্যক্তি নির্ধারিত তিথিতে তাদের কোনও পূর্বপুরুষের শ্রাদ্ধ করতে ভুলে যান, তারাও এ তিথিতে তা করতে পারেন। এই পুণ্য লগ্নে শুধুমাত্র জল প্রাপ্তিতেই পিতৃপুরুষগণ তৃপ্ত হন। ত্রেতা যুগে অবতার শ্রীরামচন্দ্র বনবাসে থাকাকালে শুধু জল দ্বারাই পিতৃপুরুষের তর্পণ করেছিলেন। মহাভারতেও পিতৃতর্পণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তর্পণকালে আজও ধর্মপ্রাণ মানুষ জগতের কল্যাণমূলক প্রার্থনাই করে থাকেন। এমনি করে উদার ভাবনায় অবগাহন করতে ভক্তদের সুযোগ করে দেয় মহালয়া।
পিতৃপুরুষদের আর্শীর্বাদ পরবর্তী প্রজন্মকে উদার করে তোলে। মনকে করে তোলে সংযমী। দশভুজা মহামায়া দুর্গাকে বরণ করতে মন হয় প্রস্তুত। পরদিন প্রতিপদ। দেবী পক্ষের শুরু। আমরা দেখেছি এবং আজও দেখি মহালয়ার দিন খুব সকালে শঙ্খধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে আবাহন ঘটে দেবী দুর্গার। ধ্বনিত হয় আগমনী সঙ্গীত,
"বাজল তোমার আলোর বেণু"।

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

ছোটবেলা কেটেছে মালদার দাল্লা গ্রাম ও শহরে। আমাদের ছোটবেলার মহালয়া মানে ঘুমচোখে শীতের সকালে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ। আজও মনে পড়ে ঘুম ঘুম চোখে মা বলতেন, “ওঠ। শুনবি না মহালয়া?” খানিকক্ষণ বিছানায় গায়ে চাদর নিয়ে শুনতাম এক মোহময় গলার অসাধারণ বর্ণনায় দেবীর আবাহন। রেডিও থেকে ভেসে আসতে থাকে তাঁর স্বর্গীয় কণ্ঠধ্বনি। সমগ্র বাঙালি সমাজকে সূর্যোদয়ের মধ্যে দিয়ে জাগিয়ে তুলে তিনি পাঠ আরম্ভ করেন...

“আশ্বিনের শারদ প্রাতে / বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জরী / ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা / প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত / জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমন বার্তা...”।

অসুরের সাথে যুদ্ধ আর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার বর্ণনা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সম্পর্কে অনেক মিথ শুনে বড় হয়েছি। তিনি সেই শীতের ভোরে, একগলা জলে ডুবে নাকি এই আবৃত্তি করতেন। সত্যি কি তাই? গলাজলে ডুবেই করুন কিংবা স্টুডিওতেই করুন, পূজার অনুষঙ্গ ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় এই মহালয়া। তাঁর গলাই জানাতো দেবীর আগমন-বার্তা। আশে-পাশের দু’একটা বাড়ির রেডিও থেকেও ভেসে আসতো এই অসম্ভব আবেগী গলা। মাঝে মাঝে গান হত। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সহ বড় বড় সব শিল্পীর গান শুনতাম। সব মিলিয়ে বুঝতাম না তেমন কিছুই। কিন্তু কেমন যেন একটা জাদু থাকতো ঐ চণ্ডীপাঠ আর গানের মধ্যে। গীতিকাব্য শুনতে শুনতে চোখের সামনে সকাল হত, সূর্যের আলো উঠত । মন বলত, আর ক’দিন পরেই দুর্গা পূজা। পূজার আগাম বার্তা। থাকতো গ্রামের মেলাতে নানান কিছু কেনার এক বুক স্বপ্ন। আর নতুন জামার গন্ধ।

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

একটু বড় বেলায় মালদা শহরে মহালয়াতে দেখতাম মহানন্দা নদীতে শয়ে শয়ে মানুষ এক কোমর জলে নেমে পিতৃ তর্পণ করছেন। সকালে প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে টেলিভিশনে শুরু হয়েছে মহালয়ার অনুষ্ঠান। কোন কোন পূজা মন্ডপে সাউন্ড বক্সে কাসেটে বাজছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ। কারণ রেডিও আজকালের প্রযুক্তির দৌড়ে পড়েছে পিছিয়ে। শহরের ছেলেমেয়েরা সকালে বেরিয়ে পড়ত বিভিন্ন জায়গায়। বিশেষ করে নদীঘাটে ও বাঁধে।

চাকরিসূত্রে রায়গঞ্জে থাকা। মহালয়া কাটাই এখন রায়গঞ্জেই। এখানে দেখি খুব সকালে কুলিক নদীর বিভিন্ন ঘাটে ভিড় উপচে পড়ছে। নিষ্ঠার সাথে পিতৃ তর্পণ করছেন অগণিত মানুষ। নদী পাড়ে ভিড় জমিয়েছে অসংখ্য লোকজন । বাড়িতে বাড়িতে টেলিভিশনে ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে ভিন্ন ভিন্ন নামে চলছে বাণিজ্যিক কায়দায় মহালয়ার অনুষ্ঠান। মোড়ে মোড়ে মাইকে বাজছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ। মণ্ডপে মণ্ডপে সাউন্ড বক্সে চিপস লাগিয়ে বাজছে আগমনী গান। সকালে , দুপুরের রায়গঞ্জ চোখে পড়ে। কাতারে কাতারে লোক ছোট থেকে বড় সকলে বেরিয়ে পড়েছে ঘরের বাইরে। মা যেন এসে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় মোটর সাইকেলের দাপাদাপি। কার গাড়ির হর্ন কত জোরে বাজে এ যেন তারই প্রতিযোগিতা। দল ধরে অনেকেই চলে যায় শহরের বাইরে। নদী, আকাশ, শিউলি, কাশ , মেঘ দেখতে। মায়ের আগমনের সাথে প্রকৃতি যেন মিলে মিশে যায়। আবার কেউ কেউ বা মেতে ওঠে পিকনিকে।

মহালয়ার দিন দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় মর্ত্যলোকে। চিরায়ত প্রথায় শুরু হয় বাঙালি হিন্দুর শ্রেষ্ঠ উৎসব। মন্দিরে মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় মহালয়ার ঘট স্থাপন। থাকে বিশেষ পূজার আয়োজন। আর সন্ধ্যায় চলে নানা অনুষ্ঠান। ঘোষিত হয় দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী মোট কথা পাঁচ দিন পর আমাদের মাঝে শোক, তাপ, দুঃখ, অমঙ্গল, অন্ধকার হরণ করে আমাদের মধ্যে আগমন করেন মা দুর্গা। তাই শুভ, মঙ্গল, আনন্দদায়ক ও আলোর দিশারী অসুরবিনাশিনী মা-কে হিমালয় থেকে মর্তে করে নেয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়। ষষ্ঠী তিথিতে হয় মায়ের বোধন। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে মা মর্ত্যলোক ত্যাগ করেন। বিষাদ মাখা মনে শুরু হয় আবার দিন গোনার পালা। এই গোটা উৎসবের শুরু মহালয়া থেকে। তাইতো মহালয়া শারদীয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহালয়ায় পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার মধ্য দিয়ে জীবনকে, জীবনবোধকে মহান করে তুলতে প্রয়াসী হয় বাঙালি । তাই মহালয়া আমাদের জীবনেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মহালয়া -যেন এক অনন্য অনুভব--সুকুমার বাড়ই

আরও দেখুন

প্রয়াত আয়ুব বাচ্চু, শোকস্তব্ধ সংগীত জগত

প্রয়াত আয়ুব বাচ্চু, শোকস্তব্ধ সংগীত জগত

Nblive অপরাজিতা জোয়ারদারঃ প্রয়াত হলেন বাংলাদেশ তথা বাংলা গানের জগতের বিখ্যাত মুখ, এই উপমহাদেশের অন্যতম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *